মো. জহিরুল ইসলাম। আমতলী মফিজউদ্দিন বালিকা বিদ্যালয়ের একজন সফল প্রধান শিক্ষক এবং আমার দেখা একজন দক্ষ, সৎ, নিষ্ঠবান শিক্ষক এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ।
নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে ছিপছিপে শারীরিক অবয়ব এবং আচরণে রাগি একজন মানুষের প্রতিকৃতি। সময়টা যতটা মনে পরে ১৯৭৬ সন। আমি দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ি। আমার বড়বোন এমইউ বালিকা বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে এবং থাকে স্কুলের হোস্টেলে। হোস্টলে তখন মরহুম মোক্তার হোসেন তালুকদারের ২ মেয়ে নাজমা ফুফু এবং পারভিজ ফুফু মরহুম আজিজ তালুকদারের ৩ মেয়ে জোসনা আপা, হেনা আপা এবং কাজল আপা এবং আমেরিকা প্রবাসী শাহআলম ভাইয়ের বোন রেহেনা আপু থাকতেন। মাঝে মাঝে বুধবার বাড়ি থেকে কিংবা বাজার থেকে কিনে দেয়া এটা ওটা মহসীন ভাই কিংবা চয়ন ভাইয়ের সাথে পৌছে দেয়ার সুযোগ হয়েছিল । তখন শান্তি স্যার প্রধান শিক্ষক পদ থেকে অব্যাহতি নিয়ে সরকারী চাকুরীতে যোগদান করেছেন এবং জহিরুল ইসলাম স্যার প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেছেন। তিনি খুবই কড়া মানুষ। আর যেকারনে হোস্টেলে যতবারই গেছি প্রতিবারই হোস্টেল সুপার জোহরা খাতুন ফুফু এবং জহিরুল ইসলাম স্যারের জেরার মুখে পরতে হত আর একারনে শিশু মনে তার প্রতি একটা ভয় তৈরী হয়েছিল। মতি বিএসসি স্যারের সুবাদে শিল্পকলা পরিষদের সাথে যুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত সে ভয়টি সব সময়ই ছিল। তাকে রাস্তায় কখনো দেখলে এমনকি স্কুলের সামনে দিয়ে হাটতেও ভয় করত। তবে একটা সময়ে শুধু শিল্পকলা নয় সম্পর্কটা পারিবারিক গন্ডি পর্যন্ত পৌছায়। স্কুলে কিংবা সামাজিক জীবনে খুব কঠিন ও রাগী প্রকৃতির হলেও শিল্পকলায় এবং পরিবারে ছিলেন খুবই মিশুক এবং রসবোধ সম্পন্ন। তার কিছু কথা মনে পরলে এখনো হাসি পায়। গ্রামে ভাত পরিবেশন করাকে ভাত বাড় বলে। স্যার দুপুরে বাসায় গিয়ে টেবিলে বেত দিয়ে জোরে বাড়ি দিয়ে নাকি বলত Rice 12. স্কুলে কোন এক অনুষ্ঠান শেষে কুকুরে খাবারের বড় ডেকছি চাটছে দেখে স্যার সবাইকে বলছে দেখ ডগ ইস চাটিং দ্যা ড্যাগ। দৈনিক যায় যায় দিন পত্রিকাকে স্যার মজা করে বলত গো গো ডে। এই রসিক মানুষটিই কর্মক্ষত্র বা সামাজিক কর্মকান্ডে ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল সৎ এবং নীতিবান। শিল্পকলার কোন অনুষ্ঠানের জন্য সরকারী বরাদ্দকৃত টাকা খরচের ক্ষেত্রেও ছিল ভীষণ মিতব্যয়ী এক কথায় কৃপণ । এক টাকা খরচ করলেও তার হিসাব দিতে হত কড়ায় গন্ডায়। নৈতিকতার প্রশ্নে ছিলেন আপোষহীন এবং কিছুটা এক রোখা। এমনকি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আমতলীর জীবন্ত কিংবদন্তি আলহাজ্ব মফিজ উদ্দিন তালুকদারও স্কুল পরিচালনার বিষয়ে কোন হস্তক্ষেপ করতেন না এবং তাকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন।
চিন্তা চেতনায় আধুনিক এই মানুষটির জন্ম ১৯৩৬ সনের ১ ফেব্রুয়ারী আমতলীর হলদিয়া ইউনিয়নে।তার পিতার নাম হাছান আলী আকন এবং মাতার নাম মানিকজান বিবি। ১৫ জানুয়ারী ১৯৫৭ সনে ধানখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ৩১ মে, ১৯৬১ সনে কলাপাড়ার তেগাছিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। পরে মফিজউদ্দিন তালুকদার ও দলিল উদ্দিন আহমেদের অনুরোধে ১৯৭৬ সনের ১ জুলাই আমতলী মফিজউদ্দিন বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। দীর্ঘ ২৪ বছর অত্যন্ত দক্ষতা এবং সফলতার সাথে প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করে ২০০০ সনে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি পরপর দুবার আমতলী শিল্পকলা পরিষদ বর্তমানে শিল্পকলা একাডেমীর সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে।
আমতলীসহ এ অঞ্চলের অত্যন্ত
শ্রদ্ধাভাজন এই শিক্ষক ২০১৯ সনের ২৭ এপ্রিল এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চির বিদায় নেন। আজ তার দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকী।
তার দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকীতে People’s Voice of Amtali -PVA এর পক্ষ থেকে জানাচ্ছি বিনম্র শ্রদ্ধা।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন