বৈশাখ মানেই বাঙালির প্রাণের উৎসব। বাঙালির জীবনে পহেলা বৈশাখ আসে অন্যরকম
স্বপ্ন আর অমিত সম্ভাবনার ফুলঝুড়ি নিয়ে, জরা ও জীর্ণ, দীনতা ও নীচতাকে
পিছে ফেলে সুন্দরের পথে অবিরাম হাঁটার ও শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার অঙ্গীকার
নিয়ে । কয়েশ’ বছর ধরে জীবনের নানা অনুষঙ্গকে ধারণ করে এ দিনটি বাঙালিরা
উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে উদযাপন করে আসছে। নতুন দিনের কেতন ওড়ানো পহেলা বৈশাখের
গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন বৈশাখী মেলা। নতুন বর্ষকে বরণের পাশাপাশি উৎসবকে
পরিপূর্ণতা দেয় বৈশাখী মেলা। এই মেলা বাঙালির শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য।
পহেলা বৈশাখ কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয় এ মেলার।
ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মোগল সম্রাট বাদশা আকবরের সময় বাংলা সনের উদ্ভবের পরপরই বৈশাখের প্রথম দিনকে উদযাপন করে আসছে । বৈশাখ উদযাপনের অনুষঙ্গ হিসেবে পরবর্তীতে যুক্ত হয়েছিলো বৈশাখী মেলা। পহেলা বৈশাখ উদযাপনে সার্বজনীন উৎসবের যে রূপ আমরা দেখতে পাই, বৈশাখী মেলা সেই রূপকে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করে।
ধারণা করা হয়, ১৮৬৪ সালে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে প্রথমবারের মতো পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান করা হয়। ১৯৭৭ সালে সাহিত্যপত্র ‘সমকাল’-এর সহযোগিতায় বরেণ্য চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান, ফোকলোরবিদ শামসুজ্জামান উদ্যোগে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রথম বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। ঢাকার বৈশাখী মেলার প্রাণকেন্দ্র ধরা হয় রমনার বটমূলকে। রমনার বটমূলকে কেন্দ্র করে শাহবাগ, সোহওয়ার্দী উদ্যান, দোয়েল চত্বর, টিএসসি এলাকায় মেলা ছড়িয়ে পরে । বিভিন্ন জেলা শহরে ও গ্রামে বৈশাখী মেলার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে এবং এ মেলা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে পরিচিত এসব মেলায় নামতো হাজার হাজার মানুষের ঢল। গ্রামের মানুষেরা নতুন দিনের আনন্দে বৈশাখী মেলায় কেনাকাটা করতে যেতো। নারীদের জন্যও বৈশাখী মেলা ছিলো আনন্দের।বৈশাখী মেলা এখন কেবল ঐতিহ্যের মেলাই নয়, এটি এখন অর্থনীতি গতিপথের বিশিষ্ট মাত্রাও বটে। আধুনিককালে এসে বৈশাখী মেলা নগর জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে গেছে ।
দেশের বাইরে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বৃহৎ পরিসরে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। লন্ডনেও বৈশাখ উপলক্ষে প্রবাসী বাঙালিরা স্ট্রিট ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করে । এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনের পোটম্যাক নদীর তীরে অবস্থিত আর্লিংটনের গেটওয়ে পার্কের সবুজ শ্যামল ছায়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে বৈশাখী মেলা।
আমতলীতে বৈশাখী মেলা ।।
আমতলীতে বৈশাখী মেলার ইতিহাস খুব পুরানো নয়। আমার যতটা মনে পরে ১৯৮৮ সনের এপ্রিল মাসের ৩ কি ৪ তারিখ হবে। আমি, আনিসুর রহমান, মুকিত খান জুয়েলসহ বেশ কয়েকজন সবার নাম এ মুহুর্তে মনে নেই বিকালে পুরাতন হাসপাতালের সামনে নজরুল স্মৃতি সংসদ অফিসে আড্ডা দিচ্ছি। এসময় একজন ফেরীওয়ালা মাটির তৈরী হাতি ঘোড়াসহ অনেক খেলনা বিক্রি করছেন। এটা দেখেই আমি পহেলা বৈশাখে আমতলীতে মেলা করা যায় কিনা প্রস্তাব দিলাম এবং সবাই এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলেন। সাথে সাথেই ছুটে গেলাম মাহবুব উল আলম ঝুন্টু তালুকদারের বাসায়।এসব বিষয়ে একমাত্র উৎসাহী মানুষ তিনি। অনেক লোকজন নিয়ে তিনি বাসার সামনের রুমে সালিশ করছেন। আমাদের দেখেই তিনি মনে করেছেন আমরা কোন চাদার জন্য গেছি। কারন তখন এ প্রোগ্রাম ও প্রোগ্রাম, লিটল ম্যাগাজিন, শিশু সংগঠনের কার্যক্রম নিয়ে সারাক্ষনই ব্যস্ত এবং এসব করতে গিয়ে চাদা ছাড়া তো বিকল্প কোন পথ নেই। আর এসব বিষয়ে সবচেয়ে বেশী চাদা দিতেন তিনি। দেখেই বললেন কি আবার কিসের চাদা। বললাম না কোন চাদা না, আমরা আমতলীতে বৈশাখী মেলা করতে চাই। উৎসাহে চেয়ার থেকে একরকম লাফিয়ে উঠলেন । বললেন ভাল আইডিয়া, তোরা ইউএনও অফিসে যা আমি আসছি আমরা যথারীতি ইউএনও অফিসে আসলাম তখন ইউএনও মিহির কান্তি মজুমদার তার অফিস ছিল বর্তমান হিসাব রক্ষন অফিস । এসে দেখলাম তিনি অফিসে নেই । দোতালা থেকে নামতে গিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান শামসুল আলম তালুকদারের সামনে পরে গেলাম তার অফিস ছিল বর্তমান যুব উন্নয়ন অফিস। জিজ্ঞেস করলেন কেন আসছি।তাকে দুটো কারনে এড়িয়ে আসলাম প্রথমত মিহির কান্তি মজুমদার আমাদের খুব প্রিয় ব্যক্তি দ্বিতীয়ত উপজেলা চেয়ারম্যান লোকজনের সামনে লেখাপড়া নিয়ে প্রশ্ন করে, কঠিন কঠিন ইংরেজী ট্রান্সালেশন, ন্যারাশন জিজ্ঞেস করে। আমরা নিচে নামতেই দেখলাম ঝুন্টু তালুকদার ইউএনওকে সাথে নিয়ে তার বাসার দিক থেকে আসছেন। সোনালী ব্যাংকের সামনের রাস্তায় আমাদের দেখেই বললেন কি জনাব কি খবর । বৈশাখী মেলা করতে চান ? । মিহির কান্তি মজুমদার ছোট বড় সকলকে জনাব সম্মোধন করতেন এবং অাপনি করে বলতেন । তার কথা শুনে বুঝলাম ঝুন্টু তালুকদার ইউএনও এর সাথে আগেই আলাপ করেছেন। রুমে গিয়ে বিস্তারিত আলাপ করলাম । জায়গা হিসাবে আমাদের প্রস্তাব ছিল কলেজ মাঠ কিন্তু সে কোনভাইে রাজি না । আমাদেরকে অনেক বুঝালেন এবং বললেন এটি প্রথম মেলা খুব জমবে বলে মনে হয় না এবং জায়গা হিসাবে বর্তমানে যেখানে স্মৃতি স্তম্ভ এখানে নির্ধারণ করলেন এবং জায়গাটি নিচু হলেও আমরাও রাজি হয়ে গেলাম । কারন আমরা মেলা নিয়ে খুবই Excited ছিলাম এবং ঝুন্টু তালুকদার ও ইউএনও এর সামনে রাজি না হওয়ার কোন সুযোগও ছিল না । তবে পরে বুঝেছি কেন আমাদেরকে কমপ্লেক্সের মধ্যে মেলা করতে বাধ্য করেছেন এবং তার নিয়ন্ত্রনের বাইরে যেতে দেননি। মেলার ভ্যেনুর জন্য আবেদন করলাম এবং তিনি অনুমোদন করে দেয়ার সাথে পুরোদমে নেমে পরলাম মেলার আয়োজন করার জন্য। কিন্তু ব্যবসায়ীরা কেউ স্টল দিতে রাজি হল না। আমরাই সিদ্ধান্ত নিলাম নিজেরা ভাগ ভাগ হয়ে স্টল করব । সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন আরেক উৎসাহী মানুষ আমাদের অণুপ্ররণা মতিয়ার রহমান বিএসসি স্যার । তিনি একে স্কুলসহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের বাধ্য করলেন স্টল দিতে। সব মিলিয়ে মেলার আয়োজন প্রায় সম্পন্ন, ১৬ টি স্টল হল। রাত জেগে গেট এবং মেলা সাজালাম। আমি নিজেও নজরুল স্মৃতি সংসদের নামে একটি স্টল দিলাম এবং স্টলে দেলোয়ার আকনের বড় একটা ডেকসেট নিয়ে হাই ভল্যুয়মে গান বাজানো শুরু করলাম। বিকালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফিতা কেটে আনুষ্ঠানিকভাবে মেলা উদ্ভোধন করবেন। আমরা অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছি। এরমধ্যে যতদুর মনে পরে মোয়াজ্জেম হোসেন চয়ন আমাদের প্রিয় চয়ন ভাই যিনি আজ আর আমাদের মাঝে নেই দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বললেন আসরের নামাজ শেষে জামে মসজিদ থেকে মুছুল্লিরা মেলা ভাংগতে এদিকে আসছে । দৌড়ে গেলাম ইউএনও স্যারের রুমে তাকে জানালাম। সেখানে ঝুন্টু তালুকদারও ছিলেন । শুনে তিনিও দৌড়ে আসলেন । এরমধ্যে দেখি মুছুল্লিরা কমপ্লেক্সের মধ্যে ডুকে গেছে এবং স্টল ভাংগা শুরু করেছে। ঝুন্টু তালুকদার তাদেরকে বাধা দিলে সংঘর্ষ শুরু হয়। তাদেরকে প্রতিরোধ করার জন্য এগিয়ে এলেন মোযাজ্জেম হোসেন ফারুক মল্লিক। তিনিও আজ আর আমাদের মাঝে নেই। রিপন তালুকদার, বুলবুলসহ আরো অনেকে । এ মুহুর্তে সবার নাম মনে নেই। সংঘর্ষে ৬/৭ জন আহত হল। পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করে । পরে আবার মেলা শুরু হলেও মেলা আর জমেনি। এখানেই শেষ নয়। রাতে হঠাৎ শুনলাম সংঘর্ষে উপজেলা চেয়ারম্যানের স্পীট বোটের ড্রাইভার আহত হয়েছে এবং তিনি বাদী হয়ে আমাদের ১৪ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করছেন। রাতেই দৌড়ে গেলাম ঝুন্টু তালুকদারের বাসায়। তিনি সব শুনে ইউএনওকে ফোন করলেন। উপজেলা চেয়ারম্যানের বাসায় গেলেন মহসীন ভাই, ফারুক মল্লিক এবং সরোয়ার ভাই। মামলা হল না সিদ্ধান্ত হল পরের দিন সালিশ হবে আমরা যদি কোন অপরাধ করে থাকি বিচার হবে । যদিও পরে বিচার তো দুরের কথা এনিয়ে আর কোন কথা হয়নি। এরপর থেকে আমতলীতে এবং আমতলীর গ্রাম-গঞ্জে অনেক ঝাক জমকভাবে বৈশাখী মেলা হচ্ছে।
সর্বোপরি পহেলা বৈশাখ ও বৈশাখী মেলা ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বাঙালির প্রাণের উৎসব ও প্রাণের মেলা হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে । নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বাঙালিরা এ মেলা উদযাপন করছে । কিন্তু এখনো কিছু মানুষ বৈশাখী মেলাকে ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে বিচার করতে চান। এ বিচার বিবেচনা কেবল স্বাধীনতার পরে নয়, আগেও ছিল । কিন্তু প্রাণের উৎসব থেমে থাকেনি। নববর্ষের অনুষ্ঠান বাঙালীর শ্রেষ্ঠ এবং সর্বজনীন উৎসব। একে কোনভাইে বাঙালী সংস্কৃতির ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।
বৈশাখী মেলার অনুষঙ্গ হচ্ছে পান্তা-ইলিশ। যতটা মনে পরে আমতলীতে প্রথম পান্তা ইলিশের আয়োজন করা হয় আমতলী ইউনিয়নের খুড়িয়ার খেয়াঘাটে। এটি নিয়ে অরেকদিন আলোচনা করব ।
ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মোগল সম্রাট বাদশা আকবরের সময় বাংলা সনের উদ্ভবের পরপরই বৈশাখের প্রথম দিনকে উদযাপন করে আসছে । বৈশাখ উদযাপনের অনুষঙ্গ হিসেবে পরবর্তীতে যুক্ত হয়েছিলো বৈশাখী মেলা। পহেলা বৈশাখ উদযাপনে সার্বজনীন উৎসবের যে রূপ আমরা দেখতে পাই, বৈশাখী মেলা সেই রূপকে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করে।
ধারণা করা হয়, ১৮৬৪ সালে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে প্রথমবারের মতো পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান করা হয়। ১৯৭৭ সালে সাহিত্যপত্র ‘সমকাল’-এর সহযোগিতায় বরেণ্য চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান, ফোকলোরবিদ শামসুজ্জামান উদ্যোগে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রথম বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। ঢাকার বৈশাখী মেলার প্রাণকেন্দ্র ধরা হয় রমনার বটমূলকে। রমনার বটমূলকে কেন্দ্র করে শাহবাগ, সোহওয়ার্দী উদ্যান, দোয়েল চত্বর, টিএসসি এলাকায় মেলা ছড়িয়ে পরে । বিভিন্ন জেলা শহরে ও গ্রামে বৈশাখী মেলার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে এবং এ মেলা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে পরিচিত এসব মেলায় নামতো হাজার হাজার মানুষের ঢল। গ্রামের মানুষেরা নতুন দিনের আনন্দে বৈশাখী মেলায় কেনাকাটা করতে যেতো। নারীদের জন্যও বৈশাখী মেলা ছিলো আনন্দের।বৈশাখী মেলা এখন কেবল ঐতিহ্যের মেলাই নয়, এটি এখন অর্থনীতি গতিপথের বিশিষ্ট মাত্রাও বটে। আধুনিককালে এসে বৈশাখী মেলা নগর জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে গেছে ।
দেশের বাইরে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বৃহৎ পরিসরে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। লন্ডনেও বৈশাখ উপলক্ষে প্রবাসী বাঙালিরা স্ট্রিট ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করে । এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনের পোটম্যাক নদীর তীরে অবস্থিত আর্লিংটনের গেটওয়ে পার্কের সবুজ শ্যামল ছায়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে বৈশাখী মেলা।
আমতলীতে বৈশাখী মেলা ।।
আমতলীতে বৈশাখী মেলার ইতিহাস খুব পুরানো নয়। আমার যতটা মনে পরে ১৯৮৮ সনের এপ্রিল মাসের ৩ কি ৪ তারিখ হবে। আমি, আনিসুর রহমান, মুকিত খান জুয়েলসহ বেশ কয়েকজন সবার নাম এ মুহুর্তে মনে নেই বিকালে পুরাতন হাসপাতালের সামনে নজরুল স্মৃতি সংসদ অফিসে আড্ডা দিচ্ছি। এসময় একজন ফেরীওয়ালা মাটির তৈরী হাতি ঘোড়াসহ অনেক খেলনা বিক্রি করছেন। এটা দেখেই আমি পহেলা বৈশাখে আমতলীতে মেলা করা যায় কিনা প্রস্তাব দিলাম এবং সবাই এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলেন। সাথে সাথেই ছুটে গেলাম মাহবুব উল আলম ঝুন্টু তালুকদারের বাসায়।এসব বিষয়ে একমাত্র উৎসাহী মানুষ তিনি। অনেক লোকজন নিয়ে তিনি বাসার সামনের রুমে সালিশ করছেন। আমাদের দেখেই তিনি মনে করেছেন আমরা কোন চাদার জন্য গেছি। কারন তখন এ প্রোগ্রাম ও প্রোগ্রাম, লিটল ম্যাগাজিন, শিশু সংগঠনের কার্যক্রম নিয়ে সারাক্ষনই ব্যস্ত এবং এসব করতে গিয়ে চাদা ছাড়া তো বিকল্প কোন পথ নেই। আর এসব বিষয়ে সবচেয়ে বেশী চাদা দিতেন তিনি। দেখেই বললেন কি আবার কিসের চাদা। বললাম না কোন চাদা না, আমরা আমতলীতে বৈশাখী মেলা করতে চাই। উৎসাহে চেয়ার থেকে একরকম লাফিয়ে উঠলেন । বললেন ভাল আইডিয়া, তোরা ইউএনও অফিসে যা আমি আসছি আমরা যথারীতি ইউএনও অফিসে আসলাম তখন ইউএনও মিহির কান্তি মজুমদার তার অফিস ছিল বর্তমান হিসাব রক্ষন অফিস । এসে দেখলাম তিনি অফিসে নেই । দোতালা থেকে নামতে গিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান শামসুল আলম তালুকদারের সামনে পরে গেলাম তার অফিস ছিল বর্তমান যুব উন্নয়ন অফিস। জিজ্ঞেস করলেন কেন আসছি।তাকে দুটো কারনে এড়িয়ে আসলাম প্রথমত মিহির কান্তি মজুমদার আমাদের খুব প্রিয় ব্যক্তি দ্বিতীয়ত উপজেলা চেয়ারম্যান লোকজনের সামনে লেখাপড়া নিয়ে প্রশ্ন করে, কঠিন কঠিন ইংরেজী ট্রান্সালেশন, ন্যারাশন জিজ্ঞেস করে। আমরা নিচে নামতেই দেখলাম ঝুন্টু তালুকদার ইউএনওকে সাথে নিয়ে তার বাসার দিক থেকে আসছেন। সোনালী ব্যাংকের সামনের রাস্তায় আমাদের দেখেই বললেন কি জনাব কি খবর । বৈশাখী মেলা করতে চান ? । মিহির কান্তি মজুমদার ছোট বড় সকলকে জনাব সম্মোধন করতেন এবং অাপনি করে বলতেন । তার কথা শুনে বুঝলাম ঝুন্টু তালুকদার ইউএনও এর সাথে আগেই আলাপ করেছেন। রুমে গিয়ে বিস্তারিত আলাপ করলাম । জায়গা হিসাবে আমাদের প্রস্তাব ছিল কলেজ মাঠ কিন্তু সে কোনভাইে রাজি না । আমাদেরকে অনেক বুঝালেন এবং বললেন এটি প্রথম মেলা খুব জমবে বলে মনে হয় না এবং জায়গা হিসাবে বর্তমানে যেখানে স্মৃতি স্তম্ভ এখানে নির্ধারণ করলেন এবং জায়গাটি নিচু হলেও আমরাও রাজি হয়ে গেলাম । কারন আমরা মেলা নিয়ে খুবই Excited ছিলাম এবং ঝুন্টু তালুকদার ও ইউএনও এর সামনে রাজি না হওয়ার কোন সুযোগও ছিল না । তবে পরে বুঝেছি কেন আমাদেরকে কমপ্লেক্সের মধ্যে মেলা করতে বাধ্য করেছেন এবং তার নিয়ন্ত্রনের বাইরে যেতে দেননি। মেলার ভ্যেনুর জন্য আবেদন করলাম এবং তিনি অনুমোদন করে দেয়ার সাথে পুরোদমে নেমে পরলাম মেলার আয়োজন করার জন্য। কিন্তু ব্যবসায়ীরা কেউ স্টল দিতে রাজি হল না। আমরাই সিদ্ধান্ত নিলাম নিজেরা ভাগ ভাগ হয়ে স্টল করব । সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন আরেক উৎসাহী মানুষ আমাদের অণুপ্ররণা মতিয়ার রহমান বিএসসি স্যার । তিনি একে স্কুলসহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের বাধ্য করলেন স্টল দিতে। সব মিলিয়ে মেলার আয়োজন প্রায় সম্পন্ন, ১৬ টি স্টল হল। রাত জেগে গেট এবং মেলা সাজালাম। আমি নিজেও নজরুল স্মৃতি সংসদের নামে একটি স্টল দিলাম এবং স্টলে দেলোয়ার আকনের বড় একটা ডেকসেট নিয়ে হাই ভল্যুয়মে গান বাজানো শুরু করলাম। বিকালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফিতা কেটে আনুষ্ঠানিকভাবে মেলা উদ্ভোধন করবেন। আমরা অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছি। এরমধ্যে যতদুর মনে পরে মোয়াজ্জেম হোসেন চয়ন আমাদের প্রিয় চয়ন ভাই যিনি আজ আর আমাদের মাঝে নেই দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বললেন আসরের নামাজ শেষে জামে মসজিদ থেকে মুছুল্লিরা মেলা ভাংগতে এদিকে আসছে । দৌড়ে গেলাম ইউএনও স্যারের রুমে তাকে জানালাম। সেখানে ঝুন্টু তালুকদারও ছিলেন । শুনে তিনিও দৌড়ে আসলেন । এরমধ্যে দেখি মুছুল্লিরা কমপ্লেক্সের মধ্যে ডুকে গেছে এবং স্টল ভাংগা শুরু করেছে। ঝুন্টু তালুকদার তাদেরকে বাধা দিলে সংঘর্ষ শুরু হয়। তাদেরকে প্রতিরোধ করার জন্য এগিয়ে এলেন মোযাজ্জেম হোসেন ফারুক মল্লিক। তিনিও আজ আর আমাদের মাঝে নেই। রিপন তালুকদার, বুলবুলসহ আরো অনেকে । এ মুহুর্তে সবার নাম মনে নেই। সংঘর্ষে ৬/৭ জন আহত হল। পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করে । পরে আবার মেলা শুরু হলেও মেলা আর জমেনি। এখানেই শেষ নয়। রাতে হঠাৎ শুনলাম সংঘর্ষে উপজেলা চেয়ারম্যানের স্পীট বোটের ড্রাইভার আহত হয়েছে এবং তিনি বাদী হয়ে আমাদের ১৪ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করছেন। রাতেই দৌড়ে গেলাম ঝুন্টু তালুকদারের বাসায়। তিনি সব শুনে ইউএনওকে ফোন করলেন। উপজেলা চেয়ারম্যানের বাসায় গেলেন মহসীন ভাই, ফারুক মল্লিক এবং সরোয়ার ভাই। মামলা হল না সিদ্ধান্ত হল পরের দিন সালিশ হবে আমরা যদি কোন অপরাধ করে থাকি বিচার হবে । যদিও পরে বিচার তো দুরের কথা এনিয়ে আর কোন কথা হয়নি। এরপর থেকে আমতলীতে এবং আমতলীর গ্রাম-গঞ্জে অনেক ঝাক জমকভাবে বৈশাখী মেলা হচ্ছে।
সর্বোপরি পহেলা বৈশাখ ও বৈশাখী মেলা ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বাঙালির প্রাণের উৎসব ও প্রাণের মেলা হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে । নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বাঙালিরা এ মেলা উদযাপন করছে । কিন্তু এখনো কিছু মানুষ বৈশাখী মেলাকে ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে বিচার করতে চান। এ বিচার বিবেচনা কেবল স্বাধীনতার পরে নয়, আগেও ছিল । কিন্তু প্রাণের উৎসব থেমে থাকেনি। নববর্ষের অনুষ্ঠান বাঙালীর শ্রেষ্ঠ এবং সর্বজনীন উৎসব। একে কোনভাইে বাঙালী সংস্কৃতির ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।
বৈশাখী মেলার অনুষঙ্গ হচ্ছে পান্তা-ইলিশ। যতটা মনে পরে আমতলীতে প্রথম পান্তা ইলিশের আয়োজন করা হয় আমতলী ইউনিয়নের খুড়িয়ার খেয়াঘাটে। এটি নিয়ে অরেকদিন আলোচনা করব ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন